ফোকলোর গবেষণার সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণে আমি বাংলাদেশের প্রবীণ ও খ্যাতনামা মরমি কবি ও লোকসঙ্গীত শিল্পী আবদুল হালিম বয়াতির সঙ্গে আন্তরিক ও নিবিড় সংলাপের মাধ্যমে বর্তমান গ্রন্থটি প্রস্তুত করেছি। ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে হালিম বয়াতির সঙ্গে আমার পরিচয়। বাংলাদেশ বেতারের প্রখ্যাত দোতারা বাদক চানমিয়া আমাকে হালিম বয়াতির মিরবাগের (ঢাকা) বাসায় নিয়ে যান এবং শিল্পীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। প্রথমদিন থেকে সংলাপ শুরু হয় এবং গ্রন্থ প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত এই সংলাপ অব্যাহত থাকে। প্রথমে আমি তাঁর শৈশবকাল, শিক্ষা, সঙ্গীত জীবন, আধ্যাত্মিক চিন্তা-চেতনা ও মানসজগৎ, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন, বিচারগান সম্পর্কে তাঁর মতামত ও ব্যাখ্যা লিপিবদ্ধ করি নোটের মাধ্যমে। এরপর তাঁর বিশাল ও সমৃদ্ধ সঙ্গীত ভাণ্ডার নিয়ে আলোচনা শুরু করি। গানের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ তিনি যেভাবে করেছেন সেইভাবেই এ বইতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, প্রতিটি গান সম্পর্কে তাঁর ধ্যান ধারণা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ প্রকাশ করে তিনি আমার চিন্তা-চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
উল্লেখ্য, এই গ্রন্থটি সম্পূর্ণরূপে হালিম বয়াতির সঙ্গে দীর্ঘ সংলাপের ভিত্তিতে রচিত। তাই Reference গ্রন্থের খুব একটা সাহায্য নিতে হয়নি। একজন জীবিত প্রবীণ ও খ্যাতিমান শিল্পীর সঙ্গে দীর্ঘ ও আন্তরিক সংলাপের ভিত্তিতে রচিত গ্রন্থটি বাংলাদেশে এই প্রথম বলে আমি মনে করি। গ্রন্থে বিচারগানের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ, মঞ্চব্যবস্থা, বিচারগান পরিবেশনের রীতি, কৌশল, সমাজ ও সংস্কৃতিতে বিচারগান, গান পরিবেশন ও কৌশলের রূপান্তর সম্পর্কে এই অভিজ্ঞ ও খ্যাতিমান শিল্পীর মতামত উপস্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশে বিচারগানের সমৃদ্ধি, প্রচার ও প্রসারে হালিম বয়াতির যে কয়েকজন বিখ্যাত ছাত্র-শিল্পী গুরুত্বপূর্ণ আবদান রেখেছেন এবং বর্তমানে যারা এই গানের সঙ্গে যুক্ত তাদের পরিচিতি তুলে ধরা হয়েছে। এই খ্যাতিমান শিল্পীর সঙ্গে আলোচনার ফলেই বিচারগানের গুণী শিল্পীদের জীবন ও কর্মের পরিচয় লিপিবদ্ধ করতে পেরেছি। তা না হলে অনেক শিল্পীরই বিস্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো।
প্রবীণ এই গুণী শিল্পী বর্তমানে আসরে গান পরিবেশন করেন না। কিন্তু আমার গবেষণা কাজে সহায়তার জন্য তিনি আমাকে গানের আসরে নিয়ে যান।
মাগুডুবা গ্রামে শিল্পী তার জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন। নাওডুবা বাজারে হোমিওপ্যাথি দোকানে বসে তিনি অসংখ্য গান রচনা করেছেন। শিল্পীর জীবন সম্পর্কে কিছু ধারণা লাভ করার জন্য আমি তাঁর গ্রামের বাড়িতে যাই এবং গানের অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করি।
আবদুল হালিম বয়াতি ১৩৩৬ বঙ্গাব্দের ১৫ কার্তিক ফরিদপুর জেলার শিবচর থানার অন্তর্গত বড়দোয়ালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম দরবেশ আবদুল জব্বার মোড়ল এবং মায়ের নাম আয়শা বেগম (বড় বিবি)। হালিমের বয়স যখন তিন বছর তখন তাঁর মা বড় বিবি মৃত্যুবরণ করেন। মায়ের মৃত্যুর পর সেজোখালা সাজু বিবি এবং ছোটখালা ছোট বিবি হালিমকে দেখাশুনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। চার বছর বয়সে হালিম দানেশ মুনশির বাড়ির কাছারি ঘরের মক্তবে ভর্তি হন। এখানে তিনি আদর্শলিপি, বাল্যশিক্ষা এবং আরবি পড়তেন। মুনশি ওয়াজউদ্দিন মাস্টার এই মক্তবে শিক্ষকতা করতেন। ইছমাইল শিকদার নামে আর একজন শিক্ষক এই মক্তবে পড়াতেন। প্রায় দু'বছর এখানে লেখাপড়ার পর তিনি তাঁর বাড়ি থেকে আধা মাইল দূরে ফজু খলিফারকান্দি বোর্ড স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন। চতুর্থ শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষার সময় তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। সুস্থ হওয়ার পর পরীক্ষা দেওয়ার জন্য স্কুলে গেলে আবদুল জলিল মাস্টার তাঁকে স্কুল থেকে বের করে দেন। মনের দুঃখে তিনি পুনরায় ওয়াজউদ্দিন মাস্টারের মক্তবে যান। এই প্রসঙ্গে হালিম বলেন, “তিনি আমাকে আদরযত্ন করে লেখাপড়া শিখান। তাঁর মক্তবে আমি পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করি। আম। বাবা একজন সুফি দরবেশ ছিলেন। তিনি চিশতিয়া তরিকার মুরিদ ছিলেন। বাবার অনেক ভক্ত ছিল। প্রতিবছর আমাদের বাড়িতে ওরস অনুষ্ঠিত হতো। ওরস উপলক্ষে মুরশিদী, মারফতী ও বৈঠকী গানের আসর বসতো। এসব গানকে 'বৈঠকী বা "দরবারি গান বলা হতো। গানগুলো ছিল মারফতী, মুরশিদী ও বিচ্ছেদী। বাবা বাদ্যযন্ত্র বাজাতে তেমন জানতেন না। তবে গাইতেন। মুরিদদের সঙ্গে আলাপচারিতার সময় মাঝে মধ্যে আধ্যাত্মিক গান গাইতেন। আমার সেজোখালা এবং ছোটখালা ঘরের মধ্যে বৈঠকী গান গাইতেন। ছোটখালু আবদুল আখন্দ চিশতিয়া তরিকার একজন মুরিদ ছিলেন। তিনিও গান গাইতেন। আমার এক দূর সম্পর্কের মামা আবদুর রশিদ মোল্লা দোতারা ও নলের বাঁশি বাজাতেন। তিনিও মাহফিলে আসতেন এবং গান পরিবেশন করতেন।"
তখনকার দিনে শিবচর অঞ্চল গান বাজনার জন্য বিখ্যাত ছিল। ঐ এলাকায় মুরশিদী, মারফতী, রাধা-বিচ্ছেদ, কৃষ্ণ-বিচ্ছেদ, গুরু-শিষ্য বিষয়ক গানকে বৈঠকী গান বলা হতো। সাধারণত মুসলমান পীর ফকিরের দরবার এবং হিন্দু সাধু গুরুদের আশ্রমে এই ধরনের গান পরিবেশিত হতো। তাছাড়া এই অঞ্চলে যাত্রাগান এবং কীর্তন প্রায়ই মঞ্চস্থ হতো। এলাকাটা ছিল হিন্দুপ্রধান। হিন্দু জমিদারগণ যাত্রা, কীর্তন, জারি ও কবিগানের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। মুসলমান প্রজাদের খুশি করার জন্য বিশেষভাবে জারিগান ও কবিগানের পৃষ্ঠপোষকতা