লোকসাহিত্য ইংরেজি (Folklore) এর প্রতিশব্দ নয়। ফোকলোরকে কেউ বলেছেন লোকলোর, কেউ বলেছেন লোকসৃষ্টি, কেউ বলেছেন লোকবিজ্ঞান প্রভৃতি। লোকসাহিত্য ইংরেজি (Folk-Literature) এর প্রতিশব্দ। লোকসাহিত্যের সংজ্ঞা নির্ণয় সহজসাধ্য নয়। বিভিন্ন জন বিভিন্ন রকম সংজ্ঞা দিয়েছেন।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, 'গ্রাম্য মানুষের মুখে মুখে রচিত সাহিত্যই লোকসাহিত্য। লোককাহিনী, গীতিকা, কিংবদন্তি, ছড়া, প্রবাদ ও নানা শ্রেণির গান নিয়ে মোটামুটি লোক সাহিত্যের কলেবর সৃষ্টি হয়েছে।'
Standard Dictionary of Folklore এর সংজ্ঞা অনুসারে, All aspects of folklore probably originally the products of individuals are taken by the folk and put through a process of recreation. Which through constant variations and repetition become a group product.
ড. মাযহারুল ইসলামের মতে, 'লোকলোর এর অঙ্গে অঙ্গে ছড়িয়ে আছে অতীতের চেতনা, অতীতের এবং অতীতে মানুষের মানসিক সম্বলিত বিচিত্র অভিজ্ঞতার নিরাভরণ প্রকাশ।'
ড. আহমদ শরীফের মতে, 'লোকসাহিত্য অক্ষমের সাহিত্য অশিক্ষিতের সাহিত্য প্রাকৃতজনের সাহিত্য। 'লোক' শব্দটাই অবজ্ঞাজনক, গান্ধির হরিজনের মতো। তাঁরা উৎকৃষ্ট সাহিত্য সৃষ্টি করেননি, তবে প্রতিভার পরিচয় দিয়েছে।'
ড. আশরাফ সিদ্দিকীর মতে, 'লোকসাহিত্যের সাধারণ সংজ্ঞাই হচ্ছে, যা লোক মুখে প্রচলিত হয়ে পূর্ববর্তী জন মুখ থেকে পরবর্তী জন মুখে বিস্তৃত হয়। রূপ-সৌন্দর্য, প্রেম- ভালোবাসা, আনন্দ-বেদনা, বিরহ-মিলন, সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, ধর্মানুভূতি প্রভৃতি বিষয়ে জীবনের খণ্ড ভাবনা, অনুভূতি, খেয়াল ও চিন্তাধারার বিবিধ প্রকাশকে লোকসাহিত্য বলে।' দানা বেঁধে গানে, ছড়ায়, কথকতায়, কিস্সা কাহিনি প্রভৃতির মাধ্যমে রস পরিবেশন করে আসছে প্রচীনকাল থেকে বর্তমান সভ্য সমাজের সর্বত্র। এই সাহিত্যের সংজ্ঞা নির্ণায়ক বিভিন্ন মতামত আলোচনা করে বোঝা যায় যে, অতীতের সংহত সমাজের মানুষ নিজের জীবনের দৃষ্টিভঙ্গিতে সুখে-দুঃখে, উত্থান-পতনে, মানব মানবীর স্বাভাবিক আকর্ষণে, আত্মার শাশ্বত প্রেরণায়, বিরহ বিচ্ছেদের মর্মদাহে যে সংগীত গেয়েছে, যে রূপকথা, উপকথা ও কিস্সা ও কাহিনি এবং ছড়া প্রভৃতি মুখে মুখে রচনা করে চলেছে তাই লোকসাহিত্য।' এই সাহিত্য ব্যক্তি মনের সৃষ্টি হয়েও ক্রমে পরিণতি লাভ করেছে সমাজের সামগ্রিক মানুষের মনের ব্যাপক সাধনায়। এ সাহিত্যকে কেউ পল্লীসাহিত্য, কেউবা গ্রাম্যসাহিত্যও বলে থাকেন। গেয়ো মানুষের সাহিত্য হিসেবে যদি একে গেয়ো সাহিত্য বলে, তাহলেও বলার কিছু থাকে না। তাই খুব সহজেই বলা চলে যে, প্রধানত লোকমুখে প্রচলিত কোন জন গোষ্ঠীর অলিখিত সাহিত্যকেই লোকসাহিত্য বলে।
এখানে উল্লেখ সংজ্ঞাসমূহ থেকে একটি মতই বেরিয়ে আসে তা হচ্ছে, লোকসাহিত্যের স্রষ্টা গ্রামের অশিক্ষিত সাধারণ মানুষ এবং তা মূলত অলিখিত সাহিত্য এবং এর কদর গ্রাম্য জনের কাছেই বেশি। শহরে সাহিত্যের শৈল্পিক উৎকর্ষ লোকসাহিত্যের মধ্যে নেই
বললেই চলে। তবু এ সাহিত্যের অতুলনীয় সম্ভারকে উপেক্ষা করা যায় না। মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী লোকসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, 'লোকসাহিত্য' তা সে যে কোন শাখার হোক তার কতগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে।
প্রথমত : সেটা লোক সাধারণের সাহিত্য অর্থাৎ তার সৃষ্টি ও প্রচলন বিশেষ শিক্ষিত এবং অভিজাত মহলে নয়, বরং সমাজের নিম্নাঞ্চলে যারা অবস্থিত, সেই প্রাকৃত জনসাধারণই এই সাহিত্যের স্রষ্টা, ধারক ও বাহক।
দ্বিতীয় : এই সাহিত্যের নির্দিষ্ট কোন রচয়িতার সন্ধান পাওয়া যায় না। অনেকস্থানেই এ সমস্ত সাহিত্যের রচয়িতা কোনো একজন নহেন, বহুব্যক্তির সমবেত প্রয়াসে এবং বহুকালের ব্যবধানে গড়ে ওঠে। কোনো একটা গান বা পালার কখনো নির্দিষ্ট একজন রচনাকারী থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লোকের মুখে মুখে তা পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং বর্ষব্যাপী লোকের ব্যবহারের ফলে হয়তো তার আদি পরিচয় আর খুঁজেই পাওয়া যায় না। এমনি করে একজনের জিনিস সমাজের সকলের সম্পত্তি হয়ে ওঠে।
