আমি সংগীতের কেউ নই। কণ্ঠে আমার সুর নেই। যাত্রাগান নিয়ে গবেষণা করেছি, কিন্তু যাত্রাগানেও এখন আর গান নেই। গানের শ্রোতা হিসেবে নিজেকে দাবি করার অধিকার আমার আছে । শ্রোতার অভিজ্ঞতা নিয়েই আমি গান নিয়ে কয়েকটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে। আমি নিশ্চিত জানি, সংগীত বোঝার জন্য ওই প্রবন্ধ তেমন গুরুত্ব বহন করে না । একপর্যায়ে এসে গান লেখা শুরু করেছি। গান লিখতে লিখতে সংগীতকে নতুনভাবে উপলব্ধি করছি। এই উপলব্ধি থেকেও সংগীত নিয়ে লেখার মতো যোগ্যতা আমার হয়নি। আমি সংগীত বিষয়ক বেশ কিছু প্রবন্ধ ও গ্রন্থ পাঠ করেছি। তখন ওই সব বিষয়ে নিজের কিছু কথাও প্রকাশ করতে ইচ্ছে করত। একসময় নিজেই লিখতে বসে গেলাম । প্রায় প্রতিটি প্রবন্ধই পত্রিকার কিংবা স্মারকগ্রন্থের পৃষ্ঠা ভরানোর উদ্দেশ্যে রচিত। এই প্রবন্ধগুলো কোনো সংগীতবোদ্ধার রচনা নয়, একজন সাধারণ শ্রোতার ভালোবাসার প্রকাশ। এভাবে দেখলেই প্রবন্ধগুলোর প্রতি সুবিচার হবে ।
স্বীকার করতে দোষ নেই যে, এগুলো তেমন পরিকল্পিত রচনা নয়। একেবারেই মুক্তহস্তে লেখা এই গদ্য । সাধারণ পাঠকের কাছে বোধগম্য করে তোলাই এই লেখার উদ্দেশ্য ছিল। বিদ্যায়তনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার গভীরতা সৃষ্ট করতে চাইনি। পাঠকমাত্রই সেটি অনুধাবন করবেন বলে আশা
বিচিত্র বিষয়ে আমার আগ্রহ। বিচিত্র বিষয়ে লিখে আমি আনন্দ পাই। আমি মনে করি শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্যে বিশুদ্ধ আনন্দটাই মুখ্য। সেই আনন্দের খোঁজে আমি ঘুরে বেড়াই। সাহিত্যের আসরের যেমন আমি হাজির হই, গানের আসরেও আমি পেছনের সারিতে গিয়ে বসি। গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ ছড়া যেমন লিখি, তেমনি এখন গান লেখাতেও মনোনিবেশ করেছি। গান নিয়ে প্রবন্ধ রচনা তাই একটা দায়িত্ব হিসেবেই মেনে নিয়েছি ।
প্রবন্ধগুলো যদি গানের প্রতি পাঠকের ভালোবাসা বৃদ্ধি করতে পারে, আমি তাতেই খুশি ।
লালন ও জসীমউদ্দীন : সাংগীতিক সখ্য
লালনের সঙ্গে জসীমউদ্দীনের কালের মিল না থাকলেও স্থানের মিল কিছুটা রয়েছে। দুজনেই পদ্মাবিধৌত দক্ষিণপ্রান্তীয় পলিমাটির সন্তান । ভৌগোলিক অবস্থানও খুব বেশি দূরে নয় । লালন তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক, গ্রাম্য কবি । জসীমউদ্দীনও যুগস্রষ্টা পল্লীকবি। দুজনেই লোকজীবন থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে সাধারণের কাছে গ্রহণীয় করে তা গানে প্রকাশ করেছেন । জসীমউদ্দীনের কবি, প্রাবন্ধিক, অধ্যাপক, কথাসাহিত্যিক পরিচয় ছাপিয়ে গীতিকার পরিচয়টিও কম গৌরবের নয়। জসীমউদ্দীনের গানে আছে লোকজীবনের রূপায়ণ ও লোকদর্শনের প্রকাশ। সেখানেই লালনের সঙ্গে জসীমউদ্দীনের মিল খোঁজা যেতে পারে ।
লালনের গানের ভক্ত ছিলেন জসীমউদ্দীন। লালনকে অনুভব করেছেন পল্লীকবির কোমল হৃদয় নিয়ে । জসীমের গান চেনার পেছনে সরাসরি লালনের প্রভাব রয়েছে কিনা, তা হয়তো নিশ্চিত করে বলা যাবে না। কিন্তু পরোক্ষ প্রভাবকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে জসীমের রচনায় ব্যক্তি লালনকেও আমার গুরুত্ব পেতে দেখি ।
গান গাওয়ার অপরাধে হাজেরা বিবি এবং তাঁর স্বামীকে যখন গ্রামবাসীরা একঘরে করে রেখেছিল, তখন তাঁরা এসেছিলেন কবি জসীমউদ্দীনের কাছে দেখা করতে । তাঁরা ‘ছোটগাঙের ওপারে হিন্দুপাড়ার কাছে একখানা কুঁড়েঘর ইলিয়া এই গ্রাম হইতে চলিয়া' যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন কবির কাছে ।
তখন কবি তাঁদের সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলেন,
"আমার গ্রামবাসীরা অন্যায়ভাবে তোমাদিগকে একঘরে করিয়াছে । তোমরা চুরি কর নাই, ডাকাতি কর নাই। শুধুমাত্র গান কর। সে গানও আল্লা-রসুলের কথায় পয়গম্বরদের কথায় ভরপুর । এই গান গাহিয়া তোমরা নানা দুঃখতাপগ্রস্ত গ্রামবাসীদের মনে সান্ত্বনার বাণী আনিয়া দাও। এজন্য যাহারা তোমাদিগকে একঘরে করিয়াছে তাহারা অন্যায় করিয়াছে । তোমাদিগকে গান গাহিতে বারণ করিয়া তাহারা দেশের অগণ্য জনসাধারণকে তোমাদের গানের আনন্দ