প্রস্তাবনা
বিংশ-একবিংশ শতকে ওসামা বিন লাদেনকে নির্মাণ এবং ধ্বংস করার পর, পাশ্চাত্য পণ্য সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রকেরা ইসলামের একাংশকে মৌলবাদ আখ্যা দিয়ে, অন্য রক্ষণশীল অংশকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্ব বাজারে তুলে ধরছে। কিন্তু ইসলামের যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ, প্রগতিশীল সাম্যচেতনার সংস্কৃতি তেমন গুরুত্ব বা প্রচার পায় না। প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি আরব-পারস্য-ইরাক- মিশর-স্পেনে সভ্যতার বিচিত্র বিকাশ ঘটেছিল। তারা গ্রিক দর্শন-সংস্কৃতিকে খ্রিস্টানদের অগ্নিদাহ থেকে রক্ষা করেছিলেন। সমস্ত ধর্মগোষ্ঠীর মতো ইসলামেও রক্ষণশীলতা এবং প্রগতিশীলতার দ্বন্দ্ব ছিল। ভিন্ন দেশকালে মুক্তবুদ্ধির মানুষদের শিক্ষা-সংস্কৃতি-ভাষা-দর্শন চেতনা, ইসলামি পরিমণ্ডলে সুফি অভিধায় চিহ্নিত হয়ে আছে।
গানে আল্লা-নবি-ফেরেস্তা-কোরান থাকলেই তাকে সুফি গান বলা যায় না। সুফি সাহিত্যে সুরা এবং সাকী ইসলামের অনুমোদিত নয়। ভারতে রাম- সীতা, রাধাকৃষ্ণ প্রভৃতি দেশজ উপাদান নিয়ে বহু সুফি গান লিখেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের লায়লা-মজনু প্রভৃতি প্রেমকাহিনী ইসলামের পূর্বযুগের। যে সুফিরা এ সমস্ত গান লিখেছেন, সাহিত্য রচেছেন, তারা নিজেদের মুসলমান বলেই পরিচয় নিয়েছেন। কিন্তু ভারতের মতো সংখ্যালঘু মুসলমানের দেশে ধর্মাক্ষনের পীড়নে এক শ্রেণির মানুষ শরিয়তের বিধিবিধান অগ্রাহ্য করে ইসলামের লক্ষণ-রেখা পার হয়ে নিজেদের ফকির, দরবেশ বলেছেন। অনেকে আরও এগিয়ে তৃতীয় সমাজ (কবীরপন্থী, নানকশাহী, কর্তাভজা)-ভুক্ত বলে আত্ম পরিচয় দিয়েছেন। হিন্দু সমাজে ভেক-সন্ন্যাস নিয়ে বহু মানুষ বর্ণাশ্রমের বাইরে চলে যায়। ধর্মান্তর থেকে পৃথক এ সমাজ বিশ্লিষ্টতা হিন্দু সমাজ স্বীকার কেক খিলাফত নিয়ে মুসলমান সাধকেরা কোরান-নবি-শরিয়তের বাইরে
মুगान জোরক্ষকেরা তাদের আর মুসলমান বলে মানতে চান এজন্য তাদের উপর দমন-পীড়ন চলে। যেহেতু তারা ধর্মান্তরিত নন, তাই অন্য ধর্মের সমাজ তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসে না। দৃষ্টান্তস্বরূপ, চৈতন্য যবন হরিদাসের কথা বলা যায়। বলা যায় উত্তরকালের শরিয়ত
অমান্যকারী বাউল ফকিরদের কথা।
যারা হিন্দু বা মুসলমান সমাজে থেকেও সাধু-ফকিরের উপসমাজ গড়ে বাস করেন, তারা এক স্বতন্ত্র দল। যারা সমাজ বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন জীবনযাপন করেন তারা আরেকটি দলভুক্ত। আর যারা ধর্মসমাজে থেকে গোপনে গুরু/মুর্শিদের ধর্মপালন করেন তাদের নিয়ে আর-একটি দল কল্পনা করা যায়। এদের অনেকে 'ধর্মরক্ষকদের চাপে ধর্মাচার স্বীকার করেন, কিন্তু তত্ত্বে বা চিন্তায় ইসলামের গতি মানেন না। ইসলামের পরিমণ্ডলেই সুফিদের কার্যকলাপ চিহ্নিত করা যায়। শেষ পর্যন্ত তাদের বিষয়গুলি ইসলামেরই ব্যাখ্যা বা সমালোচনাকেন্দ্রিক। এবং তারা শেষ পর্যন্ত নিজেদের মুসলমান বলতে ভালোবাসেন। কিন্তু আরেক দলের তাত্ত্বিক রচনায় সুফি উপাদানগুলির সঙ্গে শাত-শৈব-বৈষ্ণব উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে। তারা হিন্দু মুসলমান বলে পরিচয় না দিয়ে 'মানুষ' বলে, ফকির দরবেশ/বাউল/আউল বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। এরা বঙ্গের স্বাধীন লোকধর্মের উপাসক।
এদের গানে "আল্লা, আদম, মহম্মদ” প্রভৃতি সুফি উপাদানকে সাংস্কৃতিক পণ্য ব্যবসায়ীরা সুফি গান/কাওয়ালি বলে চালাতে চান। যেমন লালনের কোনো কোনো গান, সুফি গান হিসেবে চালানো হচ্ছে। লালনাদির রচনায় নবী, শিব, কৃষ্ণ, চৈতন্য, বেন, কোরান দেহস্থ উপাদান মাত্র। কাশী, মক্কা, মদিনা বহিতেগিতে নয়, কোরান বেদও গ্রন্থমাত্র নয়-“হিসাব কর দেহেতে তবে পারি লালন সব অন্বেষণ” (লালন সাঁই-এর গান, পদ ১৬১, ১৪৩, ৮৩, ২০)। হিন্দুর বেদ আর মুসলমানের কোরানের মধ্য দিয়ে রচিত এদের মসজিদ এদের পথ রুদ্ধ করে। কোরান, পুরাণের তালায় বন্ধ আবৃত্তি শোনা যায় হাফিজের-
My creed is oneness, my belief is abandonment of rituals. Let all communities dissolve and Consitute a faith
(মসি হাসান উদ্ধৃত, In making India Hindu, edited by David Delhi, 1996, The myth of Unity: Colonial and
National
বাংলার পুবদিকে বেসরা সুফিদের চলনবলন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাদের জীবনচর্যায় প্রভাবিত হয়ে, সাম্য এবং মর্যাদার জন্য জনগণ ইসলামে আশ্রয় নিয়েছিল। এ ইসলাম ছিল সমন্বয় প্রবণ, দেশজ উপাদানে সমৃদ্ধ এক শান্তির
আরাকানের ফকির দরবেশ কবিরা ইংদেহকে গুরুত্ব দিয়ে, নবির নূরে সব মানুষের উত্তর নির্ণয় করেছিলেন। তারা আদম ওয়ার সন্তান স আপনি বলে চিহ্নিত করেছিলেন। ফলে সরে सीमान মুছে গিয়ে মানুষেরা এক জাতিতে গণিত হয়েছিল। আর চিহ্নিত হয়েছিল আদমে আল্লাহ
প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি আরবের এক তমসাচ্ছন্ন কালে হযরত মহাম্মদ আবির্ভূত হন। সমকালীন সমাজ-অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির বিদ্রোহী সন্তান হিসাবে ইসলামের জন্ম হয়। আদি মুসলমান সমাজের ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বহু নিম্নবর্ণের মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত খলিফা আবু বক্কর ওসমান আলির উত্তরাধিকার নিয়ে প্রাদুর্ভূত হয় শিয়া গোষ্ঠী। আলি এবং তার দু'ছেলে নিহত হয়। কিন্তু প্রায় শত বর্ষ খলিফা পদটি হযরত মহাম্মদের বংশধর উন্মিয়াদের দখলে থাকে। এ সময় ইসলামি সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়। পারস্য-কনস্তান্টিনোপলের বিলাসব্যসনের প্রভাব পড়ে উচ্চবর্গের আরবের সমাজে। আব্বাস বংশীয়েরা সিংহাসন দখল করে এবং নিষ্ঠুরভাবে উন্মিয়াদের ধ্বংস ও পীড়ন করতে থাকে। আরবের বাইরে অন্যান্য মুসলমান রাজ্যে এ-দ্বন্দ্ব প্রসারিত হয়। আব্বাশীয়দের অস্বীকার করে স্পেন, মিশর স্বাধীন হয় এবং নিজেদের খলিফা ঘোষণা করে। ইসলামের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব হিসাবে একজন-খলিফার যুগ শেষ হয়। অনৈক্য এবং বহুকেন্দ্রিকতা ইসলামি সমাজ-সংস্কৃতিতে ছায়া ফেলে। অনতিকাল পরে যাযাবর উপজাতিগুলি ইসলামি দুনিয়ায় প্রবল হয়ে আরবীয়দের হটিয়ে শাসন ক্ষমতা দখল করে নেয় এবং “The unity of Islam was a thing to distant past" (
বংশগত, বৃত্তিগত নিম্নবর্গের মানুষ মুসলমান সমাজে নিজের কর্মদক্ষতায় উচ্চপদে আসীন হতো। নবি মহাম্মদের প্রযত্নে মুসলমানদের মধ্যে আর্থ- সামাজিক সাম্য স্থাপিত হয়েছিল। অচিরকাল মধ্যে বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্য বিস্তারের সুরে, আরবে সামাজিক বৈষম্য এবং শ্রেণিবৈষম্য দেখা দিল। শাসকদের ভোগ বিলাস, নিম্নবর্গের দারিদ্র্যের সমান্তরাল অবস্থানের বিরুদ্ধে বহু প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ জানা হয়েছিল। এগুলি জন্ম দিয়েছিল নানা গুপ্তগোষ্ঠীর। সাহিত্য সঙ্গীতের প্রতি ফতোয়া, ধর্মের একমাত্রিক ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদও ছিল। জাতীয় সংস্কৃতির প্রতি অবরুদ্ধ অনুরাগ থেকেও নানা ক্ষুদ্র গোষ্ঠী এ সময় দৃশ্য হয়েছিল। প্রচলিত রাষ্ট্রধর্মের সমালোচনা ছিল মধ্যযুগে, রাষ্ট্র বিরোধিতার অন্য নাম। এরকম নানা বিভিন্ন গোষ্ঠী এ সময় সুফি নামে চিহ্নিত सছिল
