ইসলাম এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ্ তাআলার মনোনীত একমাত্র দীন বা জীবনব্যবস্থা। ইসলামী শরীআত তথা জীবনবিধানের মূল উৎস আল্লাহ তাআলার কালাম কুরআন মাজীদের পর মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র হাদীস ও সুন্নাহর স্থান। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র মুখনিঃসৃত বাণী, তাঁর কর্ম এবং মৌন সমর্থন ও অনুমোদন হচ্ছে হাদীস বা সুন্নাহ্। পবিত্র কুরআনের ব্যাখ্যা এবং ইসলামী শরীআতের বিভিন্ন হুকুম-আহকাম ও দিক-নির্দেশনার জন্য হাদীসের বিকল্প নেই। প্রকৃতপক্ষে হাদীস বাদ দিয়ে কুরআন মাজীদের মর্মার্থ হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব নয়। কারণ পবিত্র কুরআন মাজীদ হলো সংক্ষিপ্ত, ইংগিতধর্মী ও ব্যঞ্জনাময় আসমানী গ্রন্থ। হাদীস হলো পবিত্র কুরআন মাজীদের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ। এ জন্য হাদীস হচ্ছে ইসলামী শরীআর দ্বিতীয় উৎস।
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আমলে এবং তাঁর তিরোধানের অব্যবহিত পরে অমানুষিক কষ্ট স্বীকার করে যে কয়জন অসাধারণ মেধাসম্পন্ন ব্যক্তি হাদীস সংকলন ও সংরক্ষণের জন্য কঠোর পরিশ্রম ও সাধনা করেছেন তাঁদের মধ্যে ইমাম আবূ আবদির রাহমান আহমদ ইবনে শু'আয়ব আন-নাসাঈ অন্যতম। যিনি সিহাহ্ সিত্তাহ্র অন্তর্ভুক্ত হাদীসগ্রন্থ সুনানে নাসাঈ শরীফ গ্রন্থটি সংকলন করেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিশুদ্ধ হাদীসসমূহ সংকলনের উদ্দেশ্যে তিনি আরব দেশসমূহের বিভিন্ন অঞ্চল সফর করেন। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাধনার ফলশ্রুতিতে এই গ্রন্থটি সংকলিত হয়। এ গ্রন্থ সংকলনের মাধ্যমে হাদীস সম্পর্কে তাঁর অসাধারণ জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সূক্ষ্ম বিচারশক্তির পরিচয় দিয়েছেন। এ গ্রন্থে মোট ৫৭৫৮টি হাদীস সংকলিত হয়েছে।
মাতৃভাষার দিক থেকে বিশ্ব মুসলিমের মধ্যে বাংলাভাষী মুসলিমের সংখ্যা শীর্ষস্থানে। এ বৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলায় মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী পৌঁছে দেয়ার নিমিত্তে সিহাহ্ সিত্তাসহ বিভিন্ন হাদীসগ্রন্থের বাংলা অনুবাদ প্রকাশের এক বৃহৎ কর্মসূচী আমরা গ্রহণ করেছি। এ কর্মসূচীর আওতায় ইতোমধ্যে বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, তিরমিযী শরীফ, আবূ দাউদ শরীফ, মিশকাত শরীফ ও রিয়াদুস সালিহীন প্রভৃতি প্রকাশিত হয়েছে। এক্ষণে সুনানে নাসাঈ শরীফের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করা হলো। এ গ্রন্থটি প্রকাশ করতে পেরে আমরা মহান আল্লাহ তা'আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া আদায় করছি। যাদের সহায়তায় এ কাজে সফলকাম হতে পেরেছি তাদের সকলের প্রতি রইল অফুরন্ত কৃতজ্ঞতা।
সাবধানতা : সাহাবায়ে কিরাম সম্পর্কে আল্লাহ তাআলার বাণী, “মহান আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর (স্রষ্টার) উপর সন্তুষ্ট”-এ ব্যাপারে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “সাহাবায়ে কিরাম সবাই ন্যায়পরায়ণ; তুমি যাকে অনুসরণ করবে নাজাত পাবে"। মহান ও পুণ্যবান সাহাবীদের কোন বক্তব্যকে অবমূল্যায়ন বা মিথ্যা ভাবলে গুনাহগার হবে। কাজেই সাহাবীদের হাদীসের সমালোচনা করা নিষিদ্ধ। সুতরাং হাদীস শরীফ পাঠকালে কোন প্রকার গরমিল বা অসামঞ্জস্য দেখা দিলে ব্যাখ্যা গ্রন্থের সাহায্য নেয়া উচিত। এতদ্ব্যতীত ফিকাহের কিতাবাদিও প্রচুর পাঠ করলে হাদীসের মর্ম অনুধাবন করা সহজতর হবে। হাদীসে কোন মাযহাবের বিপরীত কোন বর্ণনা আসলে সে মাযহাবের গ্রন্থাদি পড়ে বা ফেকাহের কিতাবাদি দৃষ্টে অথবা হক্কানী আলেমের শরণাপন্ন হয়ে সমাধানে পৌঁছতে হবে।
এ গ্রন্থখানা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বাংলা সহজ-সাবলীল চলতি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। অনুবাদের ক্ষেত্রে সুনানে নাসাঈ শরীফ-এর উপমহাদেশীয় সংস্করণের অনুসরণ করা হয়েছে। সনদের ক্ষেত্রে প্রথম রাবী এবং শেষ রাবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন কুতায়বা ইবনে সাঈদ (রহ)... আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। সনদের যেখানে তাহবীল রয়েছে সেখানে প্রথম রাবীর সঙ্গেই তাহবীলকৃত রাবীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। 'কিতাব'-কে 'অধ্যায়' এবং 'বাব'-কে 'পরিচ্ছেদ' হিসেবে সাজানো হয়েছে। আরবী, ফার্সি ও উর্দু বানানের ক্ষেত্রে আমাদের নিয়ম-নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এতদসত্ত্বেও যদি কোন ভুল-ত্রুটি পাঠক বন্ধুদের গোচরীভূত হয়, তবে গঠনমূলক উপদেশ পাঠালে পরবর্তী সংস্করণে তা শোধরাতে বাধ্য
থাকব -ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ্ তাআলা আমাদেরকে হাদীসের জ্ঞানে উদ্ভাসিত করুন এবং সুন্নাতের অনুসারী হবার তাওফীক দিন। আমীন!