হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযযালী (রহঃ) যেরূপ কারো পরিচয়ের অপেক্ষা রাখেন না, তেমনি তাঁর গ্রন্থও কারো ভূমিকার অপেক্ষা রাখে না। সুধী দুনিয়ার তিনি একান্ত প্রিয়জন, নিতান্ত শ্রদ্ধেয় গুরু। সমসাময়িক দুনিয়া তাঁকে তদানিন্তন বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম শিক্ষা নিকেতন বাগদাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ করে শিক্ষা জগতের শীর্ষদেশে ঠাই দিলেন। কিন্তু, সে বিরাট মর্যাদা ও বিপুল ঐশ্বর্য তাঁর বিবেচনায়-হল নগণ্য ও বর্জনীয় তাই চারটি বছর না ফিরতেই তিনি সেলজুক শাহের দেয়া এ পার্থিব মর্যাদা ও ঐশ্বর্য বিসর্জন দিয়ে অপার্থিব পরম ঐশ্বর্যের সন্ধানে দারিদ্র বরণ করলেন।
একটানা দশ বছর ঘুরলেন ফকীরের বেশে বিভিন্ন সাধকের দুয়ারে, দেশ থেকে দেশান্তরে। শ্রেষ্ঠতম শিক্ষাবিদ রূপান্তরিত হলেন অদ্বিতীয় সাধকে। জ্ঞানমার্গে নাস্তিকের পথ ধরে যে মনীষা পা বাড়াল একদিন, স্রষ্টায় পূর্ণ আত্মসমর্পণের মাঝে খুঁজে পেল তার পথের পরিসমাপ্তি। মন আর মগজ অবশেষে একই বিন্দুতে এসে বৃত্ত পরিভ্রমণের যবণিকা টানল।
যে কোন বিস্ময়কর প্রতিভাই অকস্মাৎ আবির্ভূত হয়ে সমসাময়িকদের কিংকর্তব্য-বিমূঢ় করে ফেলে। ফলে খুব কম লোকই সে জ্যোতিস্ককে সাদর অভ্যর্থনা জানানোর ক্ষমতা রাখে। তাঁর চোখ ঝলসানো আলো দুর্বল চোখ গুলোকে সহজেই ধাধিয়ে ফেলে। তাই তারা চারদিকে আঁধার দেখে ভাবতে থাকে, হয়তোবা কুফরীর আঁধার নেমে এল। সুতরাং স্বাগত জানানোর বদলে কুফরীর ফতোয়াই পয়লা তাদের স্বতস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসে। দিন যত যায়, চোখ ততই সাফ হয়ে আসে। অবশেষে দেখতে পায়, কুফরীর আঁধার ছিল তাদেরই চোখে। তখন তাদের কাছে সেই কাফির হন মুজাদ্দিদ এবং তিনি ইন্তিকাল করে হন রহমাতুল্লাহি আলাইহি।
ইতিহাসের চিরন্তন রীতি হিসেবেই এর পুনরাবৃত্তি চলে আসছে। তাই হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযযালী (রহঃ) এ কুফরী ফতোয়ার হাত থেকে রেহাই পেলেন না। শুধুই কি কাফির হলেন তিনি? তাঁর মহা মূল্যবান গ্রন্থাবলিও সেকালের আলিম উলামার দল জালিয়ে দিলেন সর্বত্র। গোটা-মুসলিম দুনিয়ার সে এক তুমুল ইলাহী কাণ্ড। বিস্ময়কর প্রতিভার এটাই শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন।গ্রীক দর্শনের নব রূপায়নে ডুবে মুসলিম দার্শনিকরা যখন ইসলামকে সর্বতোভাবে মানব বুদ্ধির আওতায় সীমিত করতে গিয়ে স্রষ্টার গুনাবলি এমনকি কুরাআনের অবিনশ্বরত্ব অস্বীকার করে বসলেন, মুতাযিলীদের ক্ষুরধার যুক্তির মারপেচে যখন সহজ সরল ইসলামে জটিলতম কুটতর্কের ধুম্রজাল সৃষ্টি হল, তখন গ্রীক দর্শনের একনিষ্ঠ ভক্তটি অকাট্য যুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করলেন মানব বুদ্ধির চরম সংকীর্ণতা ও পরম দৈন্যের দর্শন। যে অস্ত্রে তিনি একদিন অন্ধ আবেগকে ধরাশায়ী করে চলছিলেন ঠিক সেই অমোঘ মারণাস্ত্রেই তিনি ঘায়েল করলেন তাঁর প্রিয়তম বুদ্ধি বৃত্তির অহমিকাকে। তাঁর বুদ্ধিবাদী সত্তা আত্মসমর্পণ করল ভক্তিবাদী চিত্তের কাছে। এতদিনের শিক্ষাগুরু অবশেষে দীক্ষাগুরুর গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিলেন অসংকোচে। গোটা দুনিয়া চমকে উঠল তাঁর এ বিস্ময়কর রূপান্তরে। সেই থেকে তিনি হলেন হুজ্জাতুল ইসলাম বা ইসলামের
অকাট্য প্রমাণ।
ইমাম গাযযালী কি ছিলেন তা বলার চেয়ে তিনি কি ছিলেন না সেটা বলাই যেন সহজ। সোজা কথা তিনি মূর্খ ছিলেন না, বিভ্রান্ত ছিলেন না ফেরেশতাও ছিলেন না। মানুষ হিসেবে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে শ্রেষ্ঠতম নবীর পূর্ণতম অনুসারী হিসেবে যতটুকু বা যা কিছু হওয়া সম্ভব তা তিনি হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সমসাময়িক কালের শ্রেষ্ঠতম শিক্ষাবিদ, অদ্বিতীয় চিন্তাবিদ, অতুলনীয় লেখক, বিস্ময়কর বাগ্মী ও অনন্য সাধক। এমনকি আজ পর্যন্ত ইসলাম জগতে তাঁর প্রবর্তিত চিন্তাধারা অপ্রতিদ্বন্দি হিসাবেই বিরাজ করছে।
মহানবীর হিজরতের সারে চারশ বছর পরে ইরানে গাযযালা গ্রামে তিনি আবির্ভূত হন বলে গাযযালী নামে খ্যাত হলেন। মূল নাম মুহাম্মাদ ডাক নাম আবু হামিদ, আখ্যা পেলেন হজ্জাতুল ইসলাম। সব মিলিয়ে হল হুজ্জাতুল ইসলাম আবু হামিদ মুহাম্মাদ গাযযালী (রহঃ)। নিশাপুরের বিখ্যাত নিযামিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ইমামুল হারামাইন আবুল আলীর সুদৃষ্টিতে পড়ে তিনি তাঁরই তত্ত্বাবধানে সর্ববিদ্যায় পারদর্শিতা অর্জন করেন। বিখ্যাত ওস্তাদের জীবদ্দশায়ই তিনি বিভিন্ন গ্রন্থ লিখে এত বেশি খ্যাতি অর্জন করেন যে, ওস্তাদ তাঁকে নিয়ে গর্ব করে বেড়াতেন। ওস্তাদের ইন্তিকালের পর তিনি নিশাপুর ছেড়ে ভাগ্যঅন্বেষণে সেকালের খ্যাতনামা বিদ্যোৎশাহী নিজামুল মুলুকের দরবারে গেলেন।
