'আইলাম আর গেলাম, পাইলাম আর খাইলাম, ভবে দেখলাম শুনলাম কিছুই বুঝলাম না', 'কে বলে মানুষ মরে আমি বুঝলাম না ব্যাপার, মানুষ মরিলে তবে বিচার হবে কার’, ‘আমি কি তোর আপন ছিলাম না রে জরিনা', 'হিংসা আর নিন্দা ছাড়ো মনটা কর পরিষ্কার', 'বিধি রে মানুষের ভিতর কেন বানাইলা অন্তর'- এইসব গান শুনেই তো আমরা বড় হয়েছি। ফরিদপুরের মাঠে-ঘাটে প্রান্তরে এই গান ছড়িয়ে রয়েছে এখনো । রথীন্দ্রনাথ রায়ের কণ্ঠে এই সব গান শুনে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে, আমার জন্মগ্রামে ফরিদপুরের, অধুনা মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে তাঁকে গান গাইতে ডেকে নিয়েছিলাম স্থানীয় সৈকত একাডেমির পক্ষে । ঢাকা থেকে আমি তাঁর সফরসঙ্গী ছিলাম বলে এইসব গানের গীতিকার ও সুরকার যে আমাদের ফরিদপুরেরই কুটি মনসুর, তখন আলাপপ্রসঙ্গে তা জানা হয়ে যায় । এর আগে গানগুলোই শুনেছি, কিন্তু তাঁর স্রষ্টার নাম জানা ছিল না। যখন জানলাম যে, এই কুটি মনসুর আমাদেরই নিকট প্রতিবেশী, তখন গর্বে বুক ভরে যায় । একই মাটির সন্তান হিসেবে আমরা পরস্পর নৈকট্য অনুভব করি । রথীন্দ্রনাথ রায়ের কণ্ঠে সরাসরি এই গান শুনতে পেরে আমরা আপ্লুত হই। সেবার গভীর রাত পর্যন্ত গ্রামের মানুষ এই গান সরাসরি শোনার সৌভাগ্য অর্জন করে ।
কুটি মনসুরের বহু গান আমি বহুবার শুনেছি বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে । রথীন্দ্রনাথ ছাড়াও নীনা হামিদ, মুজিব পরদেশী ও ফকির আলমগীরের কণ্ঠে কিছু গান শুনে মুগ্ধ হয়েছি । দীর্ঘ সময় পরে অণিমা মুক্তি গমেজের কণ্ঠে 'ওরে ও দরদের আম্মাজান' গানটি শুনতে গিয়ে 'কলিজার টুকরা' শব্দটির প্রতি আমার কান আটকে যায় । এমন দরদি কণ্ঠে গানটি তিনি গেয়েছেন যে, আমি বারবার ওই গান শুনি । এরপর আরো আগ্রহ নিয়ে তাঁর কণ্ঠে 'আইলাম আর গেলাম, পাইলাম আর খাইলাম ভবে', 'কে বলে মানুষ মরে', 'যে দিন শুকাইবে দেল দরিয়ার পানি রে', 'প্রেম কইরা যে প্রেমিক মরে সই গো', 'আমার কথা তোমার মনে নাই', 'ময়না পাখি গেলো রে খাঁচার বাঁধন কাটিয়া", "সাবধানে চালাও তরী বাইয়া', 'খালি হাতে পুলসেরাতে কেমনে হব পার প্রভৃতি গানও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মাধ্যমে শোনার স্বাদ গ্রহণ করি। কুটি মনসুরের গান অণিমা মুক্তি গমেজের কণ্ঠে কম-সংখ্যক গীত হলেও আবেদনের দিক থেকে
বাংলা লোকসংগীতের জগতে কুটি মনসুর (১৯২৬-২০১৭) এক অপরিহার্য শিল্পীর নাম । লোকসংগীতের এমন কোনো আঙ্গিক নেই, যাতে তিনি কথা আর সুরের মালা গাঁখেননি । তাঁর রচিত এবং সুরারোপিত গানে আমরা খুঁজে পাই আবহমান বাংলার পলিমাটির সোঁদা গন্ধ, দিগন্তজোড়া সবুজের সরলতা আর কুলকুল রবে বয়ে চলা নদীর উদার মমতা। সহজ সরল ভাষায় তিনি বলে গেছেন মানবমনের গভীর ভাবনার কথা, চিরন্তন আবেগের কথা। বাংলার লোকসংগীতের ভাণ্ডারকে তিনি করেছেন ক্রমশ সমৃদ্ধতর । যুগে যুগে তাই এ দেশ তাঁকে স্মরণ করবে শ্রদ্ধার সঙ্গে। সবসময় এই উচ্ছ্বাস তীব্রভাবে চোখে না পড়লেও কুটি মনসুরের নাম বাঙালির অন্তরে জাগ্রত থাকবে জসীমউদ্দীন, আব্বাসউদ্দীন আহমদ, কানাইলাল শীল, মমতাজ আলী খান, আবদুল আলীম প্রমুখ গুণী শিল্পীর নামের মতো । কুটি মুনসুরের গান বাংলার জল-হাওয়া-মাটি থেকে মুছে যেতে পারে না কোনদিন । কেননা বিচিত্র অজস্র বিষয় নিয়ে প্রায় ছয় সহস্রাধিক গান রচনা ও সুরারোপ করার নজির আর কোথাও আছে কিনা আমার জানা নেই ।
লোকসংগীতে আত্মনিবেদিত এই গীতিকবি জন্মগ্রহণ করেন ২৮ ডিসেম্বর ১৯২৬ সালে ফরিদপুর জেলার চরভদ্রাসন থানার লোহারটেক গ্রামে । প্রকৃত নাম মোহাম্মদ মনসুর আলী খান । এক বোন আর তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট ছিলেন বলে তাঁর মা তাঁকে ‘কুটি' বলে ডাকতেন। মায়ের ডাকা নামটি উজ্জ্বল করে তুলেছিলেন তিনি। তাঁর মমতাময়ী সেই মায়ের নাম ছিল আবেদুন নেছা খানম আর পিতার নাম মোহাম্মদ আবেদ আলী খান। ফরিদপুর এলাকায় মনসুর নামে আরেকজন সংগীতশিল্পী থাকায় তিনি নিজের নামের আগে মায়ের দেয়া ডাকনাম 'কুটি' শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। মায়ের স্মৃতি নামের সঙ্গে বহন করে কুটি মনসুর হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের লোকসংগীতের এক অনন্য দিকপাল, মরমী সুরসাধক, স্বভাবসুন্দর গীতিকবি। আর ডাকনামই হয়ে হয়ে তাঁর মূল নাম। তিনি হয়ে কুটিভাই কিংবা কুটিচাচা ।
কুটি মনসুর একটি সংগ্রামী নাম। জীবনের প্রতিটি বাঁকে লৌহকঠিন সংগ্রামের মধ্য নিয়ে তাঁকে অগ্রসর হতে হয়েছে। শৈশবের খেলার সাথী পদ্মার ভাঙনের আর্তনাদ যেন গ্রাস করে চলেছিল কুটি মনসুরকে । তাই প্রকৃতির প্রেমে বেমালুম বুঁদ হয়ে