১৪৬ বছর আগে জন্ম কবিয়াল রমেশ শীলের। দু-দুটো বিশ্ব-যুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর, দেশ-ভাগ ছাড়াও তিনি অতিক্রম করেছেন ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। স্বদেশ ও সময়ের বহু রক্তঝরা পথ-চট্টগ্রাম বিদ্রোহ, তেভাগা, ভাষা আন্দোলন- তাঁকে পার হতে হয়েছে। ব্যক্তি-জীবনের সুখ-দুঃখ বিপর্যয়ের চড়াই-উত্রাই ডিঙিয়েছেন। দেশ-কাল সমাজের নতুন নতুন সংকটের মুখে, জনসাধারণের পাশে থেকে, গান শুনিয়ে উদ্বুদ্ধ করে এসেছেন। আর, এইভাবেই এক সময় হয়ে উঠেছেন তাদের আন্দোলনের মুখ ও মুখপাত্র।
কিন্তু তাই বলে, একজন লোক-কবির জীবৎকালে প্রাপ্ত সমাদর তাঁর মৃত্যুর ৫৪ বছর পরেও কি অবশিষ্ট থাকে? মনে সংশয় ছিল, তাঁরই জন্ম-শতবর্ষে প্রকাশিত গ্রন্থ ৪৪ বছর পর নতুন চেহারায় পাঠকের কাছে নিয়ে আসার সার্থকতা কী? সময় বদলেছে, সমাজও কিছু বদলেছে। সেখানে এ-সবের প্রাসঙ্গিকতা কোথায়? আজও তাঁর গানের অনুরাগী শ্রোতৃ-সমাজ কি আছে? স্বদেশে, গণমানসে কোথাও তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি পাওয়া যাবে? এখনও কি তিনি জনপ্রিয় এবং ব্যাপকভাবে চর্চিত?
রমেশ শীলের এই জনপ্রিয়তার গণভিত্তি জীবৎকালে কতদূর অবিশ্বাস্য ছিল তার দৃষ্টান্ত পরের ছোট্ট ঘটনার উল্লেখ থেকে পাওয়া যাবে।
১৯৬৪ সন। চট্টগ্রাম মুসলিম ইন্সটিটিউটে বুলবুল একাডেমী-প্রদত্ত কবিয়াল রমেশ শীলের সংবর্ধনা ও গান। উপস্থিত ছিলেন কবি জসীম উদ্দীন। অনুষ্ঠান শেষে রাত বারোটায় তিনি হেঁটে আত্মীয়ের বাসায় ফিরছিলেন। ফেরার পথে “গোটা হল, হলের বাইরে সম্পূর্ণ মাঠ, সামনে 'সিনেমা প্যালেস' থেকে নন্দন কানন মোড় পর্যন্ত এবং এডিসি-র পাহাড়ের ঢালুতে লোকে লোকারণ্য দেখে তিনি তাঁর সঙ্গী, গণ-নাট্যকর্মী পূর্ণেন্দু দস্তিদারকে বলেছিলেন, “পূর্ব বাংলার কোন জীবিত কবি, লেখক বা সাহিত্যিকের সংবর্ধনা সভায় এত জনসমাবেশ তিনি কোন সময় আশা করবেন না—এবং এত গরীব, সাধারণ মানুষ তন্ময় হয়ে এই সংবর্ধনা ও কবিগান শুনবে না।” কথাগুলো পূর্ণেন্দু দস্তিদার রমেশ শীলকেই এক ব্যক্তিগত চিঠিতে লিখেছিলেন।
জীবৎকালের এই জনপ্রিয়তা পরবর্তী সময়ে নতুন প্রজন্মের মধ্যে কখনও কখনও মাত্রা ছাড়া হয়ে রমেশ শীল-অনুরাগীদের উদ্বেগেরও কারণ হয়েছে। যেমন তাঁর মৃত্যুর এগারো বছর পরে, ১৯৭৮ সনে শিল্পী কলিম শরাফী বিচ্যুতির আশঙ্কা করে
রমেশ শীল (১৮৭৭- জীবৎকালে তর্কাতীতা বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি আকাশচুম্বী, যা এখনক নকাই বছরের একটি সমকালীন ইতিহাসের পার হয়েছেন। তাঁর বিশ্বযুদ্ধ ছাড়াও একে আন্দোলন, সশস্ত্র বি গণনাট্য আন্দোলন, তেভাগা, ভাষা আে পালোড়ন সৃষ্টিকারী টিকে আমূল স্পর্শ রেছে। তিনিও কা সাম্প্রদায়িক, সার রছেন। লড়াই- -বাঁধার সেই ব লাকগীতির প্রব পর গান। সমা চ. পৌরাণিক
রিয়ে রেখেছে করে নতুন। হবে, কবিয়াল তিনি শ্রেষ্ঠ রিত হয়েছে লোক-কা
প্রত্যক্ষ কা নের চরিত্রে পেরেছিয়ে
লিখেছিলেন : ... আজ দুঃখ লাগে যখন দেখি অর্বাচীন পপ গায়কেরা তার... অনবদ গানগুলো বিকৃত সুরে, বিকৃত ভাষায় গাইছে।' দৃষ্টান্ত হিসেবে ইশকুল খুইলা ছেরে ভাণ্ডারকে সংগ্রহ করা, সংহত করার প্রয়োজনীয়তা আজ তাই খুব বেশী করে। মাওলা, ইশকুল খুইলাছে' গানটির উল্লেখ করে তিনি লিখেছিলেন, “তাঁর সঙ্গীতের
অনুভব করছি।”
কলিম শরাফীর উপরের মন্তব্যের ভিতরে তার অজান্তে আগামী ইতিহাসের একটি কৌতুক লুকিয়ে ছিল। এরও ৪৩ বছর পর রমেশ শীলের যে-বিশেষ গানটিকে উপলক্ষ করে গোটা বাংলাদেশ হঠাৎ নতুন করে মেতে উঠবে সেটা এই ইশকুল খুইলাছে রে মাওলা' গানটিরই 'পপ'-রূপ।
কোভিড মহামারির দুঃসহ দুর্ভোগ, মৃত্যু ও অবর্ণনীয় সংকটে বিপর্যস্ত মানুষের দুটি বছর। ঝাঁপ বন্ধ দোকানপাট-কলকারখানা। পাশাপাশি, ও ছিল সমস্ত রকমের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানেরও অচল করা দুটি বছর। কি এ-পার বাংলার কি ও-পার বাংলায়। এই রকম এক দমবন্ধ পরিস্থিতিতে সংবাদ মাধ্যম হঠাৎ একদিন জানালো : "..দেড় বছর ধরে তারিখের পর তারিখ পড়ছে স্কুল খোলার ... শেষ পর্যন্ত ৫৪৩ দিন পর ১২ সেপ্টেম্বর খুললো স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা। আর ঠিক তার দুদিন আগে বিখ্যাত গানের ব্যান্ড দল 'জলের গানে'র কভারে মুক্তি পেলে তাদের নতুন গান “ইশকুল খুইলাছেরে মাওলা, ইশকুল খুইলাছে। দেশজুড়ে কোমলমতি শিশুদের স্কুল খোলার আনন্দের মধ্যে এই গানটি সামাজিক মাধ্যমে তুলেছে নতুন আলোড়ন।”
সংবাদ মাধ্যম আরও জানালো : 'চমৎকৃত করবার মতন একটি সংবাদ : ৫৪ বছর পর রচিত হলে নতুন ইতিহাস। গত প্রায় সোয়া শতাব্দী ধরে কবিয়াল রমেশ শীলের অসংখ্য গান বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে দুই বাংলার সংগীত ভুবনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো...রমেশ শীলের তিরোধানের ৫৪ বছর পর এই প্রথম ‘আইপিডিসি আমাদের গান' কর্তৃপক্ষ কবিয়াল রমেশ শীলের গান রেকর্ড বা বাণিজ্যিক বিপণনের ক্ষেত্রে তার উত্তরাধিকারীদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করে অনুমতি নিল এবং সম্মানী দিল' (১৮.৪.২১)।
তবে কথা হচ্ছে, জনপ্রিয়তার এই আকস্মিক জলোচ্ছ্বাসের মতন ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন বিবেচনায় সারিয়ে রাখলেও, প্রায় নিয়মিতই বাংলাদেশের সমাজমাধ্যমে রমেশ শীল-চর্চা হয়ে এসেছে। এবং আশ্চর্যের বিষয়, এখনও এত বছর পরেও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করা হয়। তার মূল্যায়নে নজরে পড়ে এই সময়ের শ্রোতা-সমাজের রমেশ শীলের প্রতিটি জন্মদিন-মৃত্যুদিন উপলক্ষে বিশেষত, দেশজুড়ে নিয়মিত অকুণ্ঠ মুগ্ধতা, যার অসংখ্য বয়ান অন্তর্জালে ছড়িয়ে আছে। পাঠককে অবহিত করার জন্য সে-সব থেকে গত পাঁচ বছরের রমেশ শীল-স্মরণের কিছু পরিচয়
কালানুক্রমিকভাবে দেওয়া যেতে পারে।